০৮ নভেম্বর ২০২৬ , ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাবার নতুন ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ০৮-১১-২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাবার নতুন ইতিহাস ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়েছেন সাবা হায়দার। ২০০৭ সালে বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। শিকাগোতে বসতি গড়ে শুরুতে যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন তিনি। পরে যুক্ত হন সামাজিক কর্মকাণ্ডে, সেখান থেকে স্থানীয় রাজনীতিতে। প্রথম নির্বাচনে পরাজিত হলেও হাল ছাড়েননি। দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ৮৪তম হাউস ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিক।

গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বড় ব্যবধানে জয় পান সাবা। তিনি পেয়েছেন ২০ হাজার ৭৫৬ ভোট, যা মোট ভোটের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রায়ান স্কোপা পেয়েছেন ৮ হাজার ৫২০ ভোট। এ জয়ের মধ্য দিয়ে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম দক্ষিণ এশীয় নারী হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি। ওই নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অন্তত ৩০ জন প্রার্থীও জয়ী হয়েছেন।

৪২ বছর বয়সী সাবার পরিবারের শিকড় ভারতের উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহর জেলার আওরঙ্গাবাদে। ভারতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাঁর। বাবা সৈয়দ আলী হায়দার অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী, মা চাঁদনি। তাঁদের পৈতৃক বাড়ি গাজিয়াবাদে। মেয়ের নির্বাচনী জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। সাবার বাবা এই অর্জনকে শুধু পরিবারের নয়, পুরো দেশের জন্য গর্বের মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেছেন।

গাজিয়াবাদের হলি চাইল্ড স্কুলে পড়াশোনা করেন সাবা। পরে রাম চামেলি চাড্ডা বিশ্বাস গার্লস কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে বন্যপ্রাণী বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি স্বর্ণপদকও পান।

ছোটবেলা থেকেই সামাজিক ও জনস্বার্থমূলক বিষয়ে আগ্রহ ছিল তাঁর। মা চাঁদনির ভাষ্য, স্কুলজীবনে বিতর্ক ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতেন সাবা। মানুষের সামনে নিজের মতামত তুলে ধরার আগ্রহ তখন থেকেই তৈরি হয় তাঁর মধ্যে।

২০০৬ সালে বুলন্দশহরের কম্পিউটারবিজ্ঞান প্রকৌশলী আলী কাজমিকে বিয়ে করেন সাবা। তাঁদের দুই সন্তান—১৬ বছর বয়সী আজিম ও ১২ বছর বয়সী আইজা। বিয়ের পর ২০০৭ সালে স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। শিকাগো এলাকায় বসতি গড়ে নতুন পরিবেশে জীবন শুরু করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সার্টিফায়েড যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন সাবা। পরে কলেজশিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও করপোরেট পেশাজীবীদের যোগব্যায়াম শেখাতে শুরু করেন। বন্যপ্রাণী বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলেও নতুন দেশে সুস্থ জীবনযাপন ও শরীরচর্চার জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। এ কাজের সুবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও যোগাযোগ গড়ে ওঠে।

যোগব্যায়াম শেখানোর পাশাপাশি স্থানীয় নানা সামাজিক উদ্যোগেও যুক্ত হন সাবা। মানুষের সমস্যা, চাহিদা ও এলাকার উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কমিউনিটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে প্রবেশের পথ তৈরি করতে এই সামাজিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নিজের রাজনৈতিক প্রচারে সাবা বলেন, যে কমিউনিটি তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ইলিনয়কে আপন করে নিতে সাহায্য করেছে, সেই মানুষের জন্য কাজ করাকেই তিনি জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন। তাঁর মা চাঁদনিও মেয়ের এই পথচলায় স্বামী আলী কাজমির সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে কাজ ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সাবা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।

তবে রাজনীতিতে সাবার পথচলা সহজ ছিল না। ২০২২ সালের নভেম্বরে ডুপেজ কাউন্টি বোর্ডের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। প্রথমবার প্রায় এক হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি। কিন্তু এই হার তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া এবং তাঁদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা শোনার কাজ অব্যাহত রাখেন।

এরপর ২০২৪ সালে আবারও ডুপেজ কাউন্টি বোর্ডের নির্বাচনে অংশ নেন সাবা। এবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান দলের বর্তমান সদস্য প্যাটি গুস্টিন। তাঁকে পরাজিত করে বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। নির্বাচনে সাবা পান ৪০ হাজার ৩৩০ ভোট, আর গুস্টিন পান ৩১ হাজার ৩৯৫ ভোট।

কাউন্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পরিবেশ ও কৌশলগত পরিকল্পনাসংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান সাবা। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন কাজেও যুক্ত ছিলেন। ডুপেজ কাউন্টি স্বাস্থ্য বিভাগের জনস্বাস্থ্য বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা ইন্ডিয়ান প্রেইরি এডুকেশনাল ফাউন্ডেশনের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক হিসেবে শুরু হওয়া সাবার সামাজিক কর্মকাণ্ড এভাবেই তাঁকে স্থানীয় প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়ে যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

ইলিনয়ের ৮৪তম হাউস ডিস্ট্রিক্টের আওতায় উইল, ডুপেজ, কেইন ও কেন্ডাল কাউন্টির কিছু অংশ রয়েছে।

অরোরা, ন্যাপারভিল, অসওয়েগো, মন্টগোমারি ও বোল্ডার হিল এ এলাকার উল্লেখযোগ্য জনপদ।

নির্বাচনী প্রচারে জীবনযাত্রার ব্যয়, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেন সাবা।

তাঁর মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবারের বাড়তি খরচের চাপে কর্মজীবী মানুষ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। তাই স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

সাবা জানান, নির্বাচনের আগে টানা ১৫ মাস তাঁর প্রচার দল নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। বাসিন্দাদের সমস্যা, প্রত্যাশা ও উদ্বেগের কথা শুনে সেসব মতামতের ভিত্তিতেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাজানো হয়েছে। বিজয়ের পর নিজের প্রচারাভিযানকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ